মসলার যুদ্ধ -সত্যেন সেন(বুক রিভিউ)

মসলাঃ একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা।
মসলা আমাদের সবার নিকট খুবই সাধারণ ও পরিচিত নাম । প্রয়োজনীয় কিন্তু এর শেষ পরিণতি ময়লার ঝুড়ি।।

রান্নায় মশলা ছাড়া আপনি যেমন কল্পনা করতে পারেননা তেমনিভাবে মশলা জাতি,দেশ এবং সর্বোপরি একটি ইতিহাস পাল্টে দিয়েছে। এবং সূচনা করেছে এক রক্তাক্ত ও করুণ ইতিহাসের।

মসলা ইসলাম প্রচারের ও অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ইউরোপীয়দের মসলার চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আরব বণিকরা দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আগমন করেছে এবং তাদের সাথে এসেছে সুফি,দরবেশ যারা উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছেন।।

প্রাচীনকাল থেকেই ইউরোপে প্রাচ্যের মসলার চাহিদা ছিল। রোমের সর্বত্র গোল মরিচ ও আদার চাহিদা ছিল প্রচুর এবং এগুলো সেখানে স্বর্ণ ও রৌপ্যের ওজনে বিক্রি হত। আজকালকার দিনে গোল মরিচের মূল্যই বা কতটুকু।

কিন্তু সে সময় গোল মরিচ ছিল মণিমুক্তার মত মূল্যবান। এ কথা শুনলে কে বিশ্বাস করবে?এই গোল মরিচের জন্য জীবন বাজি রেখে বিপদসংকুল সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে। যুদ্ধ করেছে এবং জীবন দিয়েছে।

মসলার আকর্ষণ মূলত ইউরোপীয়দের দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় আগমনের পটভূমি তৈরী করেছিল। ইহা সর্বজনস্বীকৃত যে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সম্পদের ও সমৃদ্ধির প্রধান উৎস মসলা। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৈদেশিক বাণিজ্য ‘ মসলা বাণিজ্য ‘ নামে অভিহিত হয়।

ভারতবর্ষের দক্ষিণতম প্রান্তে বর্তমান ব্যাঙ্গালোর থেকে আরব মহাসাগরের ভূভাগ পর্যন্ত যে এলাকা তা মালাবার যা মসলার অন্যতম কেন্দ্র।। মালাবারে কতগুলো ছোট স্বাধীন রাজ্য ছিল যার অন্যতম কালিকট।

কালিকটের রাজা জামোরিন। কালিকটের শক্তির মূল উৎসই ছিল মসলা।মালয়,,ইন্দোনেশিয়ায় যে মসলা উৎপন্ন হত তা এখানে জমা হত।
১৪৮৮ খ্ৰীষ্টাব্দ। প্রথম পেরোডা কভিলহাম নামক একজন পর্তুগীজ ছদ্মবেশে কালিকট বন্দরে আসে খোঁজ খবর নেয়ার জন্য।।

এর ঠিক ১০ বছর পর ১৪৯৮পর্তুগীজরা প্রকাশ্যে আসে।। এই পর্তুগীজ বণিকদলের অধিনায়ক সবার পরিচিত নাম ভাস্কো দ্যা গামা। তারপরে আসে পেড্রো আলভারেজ কাব্রাল।

তার ওপর আদেশ ছিল, জামোরিনের কাছে ব্যবসা ও ধর্মপ্রচারের অনুমতি চাওয়া। না দিলে যুদ্ধ । জামোরিন তাকে সাদরে গ্রহণ করলেও কাব্রালের সহচর কোরিয়ার দুর্ব্যবহারের কারণে ঐক্য টিকে নি এবং এর মাধ্যমেই শুরু হয় যুদ্ধ যা” মসলার যুদ্ধ “

কালিকট শক্তিতে পর্তুগীজদের সমান কখনোই ছিল না। কিন্তু তাদের ছিল অপরিমিত দেশ প্রেম এবং একাগ্রচিত্ততা। পর্তুগীজদের মাধ্যমেই এদেশের মানুষ প্রথম কামান দেখে।
পর্তুগীজদের প্রধান শত্রুই ছিল মুসলমান।

তারা নির্বিচারে ও নৃশংসভাবে মুসলমানদের হত্যা করে। চৈনি,, হিন্দু তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়। তবে কালিকট হিন্দু রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও তাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি।কিন্তু কালিকট তার স্বাধীন সত্ত্বা বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

প্রাচ্যের বুকে ঔপনিবেশিকবাদের প্রথম আঘাত কালিকটকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। কালিকট অধিকারে ব্যর্থ হয়ে আল বুকার্ক ১৫১০ গোয়া অধিকার করেন। হুিন্দু রাজার সহযোগীতায়।

গোয়া দখলের পর রাজা ডোম ম্যানুয়েলের কাছে লেখেন,” আমরা এখানে যে সমস্ত আরবী ছিল তাদের হত্যা করেছি,, কেউ আমাদের হাত থেকে রেহাই পায় নি।। আমরা তাদের মসজিদে আটকে রেখে আগুন জালিয়ে দিয়েছি।

এরপর বুকার্কের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পড়ে মসলা সমৃদ্ধ ইন্দোনেশিয়ায়। ইন্দোনেশিয়ায় তখন হিন্দু মুসলমান বিরোধ চলছিল যা যেকোনো বিদেশি শক্তির জন্যই কল্যাণকর। ইন্দোনেশিয়া দখল করে নেয়। এবার আসে মালাক্কা।

মালাক্কা সে সময়ে ছিল সমৃদ্ধ বন্দরনগরী। এখানে সব মশলা জমা হতো এবং তা বিভিন্ন দেশে যেত।১৫০৯ এ স্যাকুরা মালাক্কা যায় এবং সুলতানের নিকট বাণিজ্য অনুমতি লাভ করে কিন্তু আরব বণিকরা পর্তুগীজদের ভালো করেই চিনত।

তারা সুলতানকে পর্তুগীজদের সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়। সুলতান তাদের বিতারণের মনঃস্থ করলে ১৫১১ আল বুকার্ক মালাক্কা আআক্রমণ করে। তার আক্রোশ ছিল মুসলমানদের ওপর।

ব্যাপকহারে মুসলিম নিধন করে। এবং ঘোষণা করে আমরা আরবীদের ধ্বংস করব। মহম্মদের ধর্ম নিভিয়ে দিব। মসলা বাণিজ্য কেড়ে নিব তাহলে কায়রো ও মক্কা ধ্বংস হবে।
এর পরে মসলা বাণিজ্যের লোভে আসে ডাচরা।

১৫৯৫ প্রথম বাণিজ্য মিশন আসে। এবং ব্যাপক লাভ করে। তারপর ১৬০২ সালে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করে।এবং পর্তুগীজদের সাথে দ্বন্ধে লিপ্ত হয়। ডাচদের সাথে প্রতিযোগীতায় টিকতে না পেরে পর্তুগীজরা পিছু হটে।

এরপর আসে ইংরেজ্ এভাবেই আবির্ভূত হয় সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ইতিহা।। অবশেষে এই দেশগুলো ঔপনিবেশিক অধীনতার নাগপাশ থেকে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা পায়।

এক মসলা কিভাবে একটি জাতিকে অন্য জাতির নিকট যুগের পর যুগ দাস বানিয়ে রেখেছিল তা সত্যিই আশ্চর্য হওয়ার বিষয়। ভারতবর্ষে ও ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসে মশলা খুবই উল্লেখযোগ্য।এখানকার মসলা পরপর তিনটি ইউরোপীয় শক্তিকে আকর্ষণ করে নিয়ে এসেছে।

বাণিজ্য করতে এসে শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্য স্থাপন করল। এই মসলা যুদ্ধ মনে দিয়ে কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে কত দেশ স্বাধীনতা হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তবে এই মসলার যুদ্ধ ই আবার পশ্চাৎমুখী সমাজকে পরিবর্তনের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

বদ্ধ জীবনের উপরে দুরন্ত ঝটিকার আলোড়ন জাগিয়েছে। প্রচন্ড অত্যাচারের শক্তি স্বপ্ন- দেখা ঘুমন্ত মানুষকে চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলেছে। ওটাও সত্য, এটাও সত্য কোনোটাই মিথ্যে নয়।

মসলার যুদ্ধ বইটির রিভিউ করেছেন

হাবিবা
ইতিহাস বিভাগ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here