সর্বকালের সেরা ১০ গণিতবিদ

0
219
সর্বকালের সেরা ১০ গণিতবিদ

গণিতের আজকের এই অবস্থায় আসতে বহু গণিতবিদের অবদান রয়েছে। আজ আমরা আলোচনা করবো সর্বকালের সেরা ১০ গণিতবিদ কে নিয়ে।

গণিতের সার্বজনীন ভাষা ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা একে অপরের সাথে ধারণার আদান-প্রদান করেন। গণিত তাই বিজ্ঞানের ভাষা।

১. পিথাগোরাস(৫৭০- ৪৯৫ খ্রিস্টপূর্ব)

সামোসের পিথাগোরাস হলেন প্রাচীন গ্রীক গণিতবিদ। তিনি সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজ, লম্ব ও ভূমি সম্পর্কিত উপপাদ্যের জন্য বিখ্যাত। যেটি পিথাগোরাসের উপপাদ্য নামে পরিচিত।

তিনি এমন এক সম্প্রদায়ে বসবাস করতেন যেখানে সংখ্যাকে তাদের আধ্যাত্মিক গুণাবলী হিসেবে বিবেচনা করা হত।

তার সংখ্যার উন্নতিসাধন তাকে গ্রীক গণিতের আদিপুরুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আরও একটা মজার বিষয় হচ্ছে তিনি মটরশুঁটি খেতেন না।

২. হাইপেশিয়া (৩৭০ – মার্চ, ৪১৫)

গণিতে সাধারণত পুরুষের প্রতিনিধিত্ব বেশি, কিন্তু নারীর উপস্থিতি যে মোটেই নেই, এমন না। এমন একজন নারী গণিতবিদ হলেন হাইপেশিয়া।

তিনি খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরিতে পণ্ডিত ছিলেন।

তার পিতার নাম থিওন। তিনিও একজন খ্যাতিমান গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক ছিলেন এবং হাইপেশিয়াকে মৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিতকরণে তার ভূমিকাই ছিল সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ।

যাহোক ৪০০ সালের দিকে হাইপেশিয়া আলেক্সান্দ্রিয়ার নব্য প্লেটোবাদী দর্শনধারার মূল ব্যক্তিত্বে পরিণত হন এবং খ্যাতির চরম শিখরে আরোহণ করেন।

তার মধ্যে অসাধারণ বাগ্মীতা, বিনয় এবং সৌন্দর্য্যের সার্থক সম্মিলন ঘটেছিল। এজন্য তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীর আকর্ষণ লাভ করতে সমর্থ হন।

 ৪১৪ সালে আলেক্সান্দ্রিয়ায় ইহুদী বিতারণের সূচনার মাধ্যমে বিপর্যয়ের ঘনঘটা দেখা দেয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ৪১৫ সালে একদল ধর্মোন্মাদ খৃস্টান জনতার হাতে হাইপেশিয়া নিহত হন।

বর্ণনামতে রথে করে ফেরার পথে উন্মত্ত জনতা তার উপর হামলা করে এবং হত্যার পর তার লাশ কেটে টুকরো টুকরো করে রাস্তায় ছড়িয়ে দেয়া হয়।

অনেক বিশেষজ্ঞই তার মৃত্যুকে প্রাচীন আন্তর্জাতিক শিক্ষাকেন্দ্র আলেক্সান্দ্রিয়ার পতনের সূচনাকাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

তিনি গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও দর্শনশাস্ত্রে অবদান রেখেছেন।

৩.জিরোলামো কার্দানো(১৫০১-১৫৭৬)

জিরোলামো কার্দানো ছিলেনএকজন ইতালীয় চিকিৎসক, গণিতবিদ, জ্যোতিষী ও জুয়াড়ি। তিনি ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত প্রতিভাধর ছিলেন। বড় হয়ে তিনি এক উচ্ছৃঙ্খল বহুশাস্ত্রজ্ঞে পরিণত হন।

তিনি ১৫৪৩ সালে পাভিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৫৬২ সালে বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। 

কার্দানো প্রায় ২০০টির মত বই লিখেছিলেন, তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হল আর্স মাগ্‌না (Ars Magna) বইটি।

এই বইতেই সাধারণ ত্রিঘাত সমীকরণ ও সাধারণ চতুর্ঘাত সমীকরণের সমাধান প্রথম প্রকাশিত হয়, যদিও এই সমাধান দুইটিতে যথাক্রমে তারতাইলিয়া ও কার্দানোর সহকারী লুদোভিকো ফেরারি’র অবদান ছিল।

কার্দানো তার সময়কার বীজগণিত ও ত্রিকোণমিতিতে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন একজন অসাধারণ গণিতবিদ ছিলেন।

কার্দানোর আরেকটি বিখ্যাত বই হল লিবের দে লুদো আলেয়ায়ে (Liber de ludo aleae), যাতে গাণিতিক সম্ভাবনার একেবারে প্রাথমিক কিছু গাণিতিক ধারণা সন্নিবিষ্ট হয়েছে; এই বইতে কার্দানো তার জুয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগান।

. লেওনার্ড অয়লার(১৭০৭-১৭৮৩ )

অয়লার কে বিবেচনা করা হয় সর্বকালের সেরা গণিতদের ভিতর অন্যতম মেধাবী। তিনি প্রায় ৯০০র মত বই প্রকাশ করেছেন। তিনি ক্যালকুলাস, সংখ্যাতত্ত্ব, অন্তরক সমীকরণ, গ্রাফ তত্ত্ব ও টপোগণিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

অয়লার e , π , যোগের জন্য Σ চিহ্নের প্রবর্তন করেন। তার বিখ্যাত সমীকরণ

এটাকে “সর্বকালের সবচেয়ে সুন্দর গাণিতিক সমীকরণ” বলা হয়। তিনি লাতিন squares – grids এও মনযোগ দিয়েছিলেন যেখানে সব কলাম ও সারিতে সংখ্যা থাকবে, যেটা সুডোকুতে থাকে।

৫. কার্ল ফ্রিড‌রিশ গাউস  (১৭৭৭–১৮৫৫)

গাউসকে বলা হয় “গণিতের যুবরাজ” ও “সর্বকালের সেরা গণিতবিদ”। গণিত এবং বিজ্ঞানের বহু শাখায় তার প্রশংসাযোগ্য প্রভাব ছিল, যে কারণে তাকে ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী গণিতবিদদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তার উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে  অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতি, যেটি তার মৃত্যুর পর পাওয়া যায়। জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের সময় তিনি দেখেন যে, measurement error একটি bell curve উৎপন্ন করে, যেটা Gaussian distribution নামে পরিচিত।

৬. গেয়র্গ কান্টর(১৮৪৫-১৯১৮)

গেয়র্গ কান্টর একজন জার্মান গণিতবিদ যিনি তার সেট তত্ত্ব সংক্রান্ত কাজের জন্য সুপরিচিত, যা গণিতের একটি ভিত্তিসূচক তত্ত্বে পরিণত হয়েছে। কান্টরের তত্ত্ব “অসীম সংখ্যক অসীমের” ধারণা দেয়। এটা ছিল খুব তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু তিনি মাঝে মাঝে মানষিক সমস্যায় ভুগতেন এবং তাকে হাসপাতালে যেতে হত।

৭.পল এর্ডশ(১৯১৩-১৯৯৬)

পল এর্ডশ হাঙ্গেরীয় গণিতবিদ। তিনি শত শত সহযোগীর সাথে গুচ্ছ-বিন্যাসতত্ত্ব ( গ্রাফ তত্ত্ব, সংখ্যাতত্ত্ব, ধ্রুপদী বিশ্লেষণ, আসন্ন মান নির্ণয় তত্ত্ব , সেটতত্ত্ব ও সম্ভাবনাতত্ত্বের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গবেষণা করেছেন।

এর্ডশ গণিতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশকারীদের মধ্যে অন্যতম। আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে লিওনার্ট অয়লারের পর তিনিই সবচেয়ে বেশি লিখেছেন।

তিনি তার জীবদ্দশায় প্রায় ১৫০০ গাণিতিক প্রবন্ধ লেখেন যেগুলোর বেশির ভাগই ছিল কোন সহ-লেখকের সাথে লেখা।

তার প্রায় ৫০০ সহযোগী ছিল; গণিত যে একটি সামাজিক কর্মকান্ড হতে পারে এ ব্যাপারে তার দৃঢ বিশ্বাস ছিল এবং তা তিনি হাতেকলমে করেও দেখিয়েছেন।

৮. জন হর্টন কনওয়ে(১৯৩৭- )

জন হর্টন কনওয়ে খেলা ও পাজল নিয়ে গবেষণার জন্য বিখ্যাত। এছাড়াও গণিতের অন্যান্য অনেক শাখায় তিনি অবদান রেখেছেন।

সসীম গ্রুপ, সংখ্যা তত্ত্ব, knot theory, কম্বিনেটোরিয়াল গেম থিওরি এবং কোডিং থিওরিতে কাজের জন্য তিনি প্রসিদ্ধ।

বিনোদন মূলক গণিতের বিভিন্ন শাখায়ও তার প্রভূত অবদান রয়েছে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জীবনের খেলা নামক সেলুলার অটোমাটন আবিষ্কার।

৯. গ্রিগরি পেরেলম্যান (১৯৬৬- )

গ্রিগরি পেরেলম্যান হচ্ছেন বিখ্যাত রুশ গণিতবিদ। তিনি পয়েনকেয়ার অনুমিতির প্রমাণ করেন যে তত্ত্বটা হেনরি পয়েনকেয়ার ১৯০৪ সালে দিয়েছিলেন।

যেটা অমীমাংসিত সমস্যা হিসেবে থেকে যায় গত এক শতক। এর জন্য ২০০৬ সালে তিনি ফিল্ডস পদক পান, এই পুরষ্কার গণিতের নোবেল হিসেবে খ্যাত কিন্তু তিনি এ পুরষ্কার নিতে অস্বীকৃতি জানান।

১০. টেরেন্স টাও(১৯৭৫- )

টেরেন্স টাও একজন অস্ট্রেলীয় গণিতবিদ। তিনি ২০০৬ সালে ফিল্ডস পদক লাভ করেন।

তিনি ও বেন গ্রীন মিলে প্রমাণ করেন যে, মৌলিক সংখ্যা একটা মজার ফলাফল দেয়। যেমনঃ ৫,৭,১১,১৭ মৌলিক সংখ্যা যাদের মধ্যকার দূরত্ব ৪। আবার ১৭,২৩,২৯ মৌলিক সংখ্যার মধ্যকার দূরত্ব ৬।

মাত্র ২৫ বছর বয়সে  ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলস এ ২০০০ সালে পূর্ণ অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।

আশা করি সর্বকালের সেরা ১০ গণিতবিদ সম্পর্কে লেখাটি ভাল লেগেছে। আপনার মতামত জানাতে পারেন কমেন্ট বক্সে।

আরও পড়ুন

কিছু বাঙালি গণিতবিদঃ যাদের অবদানে গণিত আজ সম্মৃদ্ধ

৬১৭৪ -কাপেরেকার ধ্রুবকঃ রহস্যময় এক অদ্ভুদ সংখ্যা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here